ছায়াবৃত্ত
Free
ফ্রি বই — ওয়েবসাইটেই পড়তে পারবেন (ডাউনলোড করা যাবে না)।
ছায়াবৃত্ত
অনীশ দাস অপু / আবদুল্লাহ্ ওমর সাইফ
আমার নাম জুনায়েদ হায়দার পাশা। লেখক।
অবশ্য সাহিত্যজগতে এখন আমার আর কোন নামডাক নেই। এককালে লিখতাম রহস্য উপন্যাস, পাতায় পাতায় শিহরণ। সত্যি বলতে কী, ওই একটা সময় ছিল! লেখা বাজারে আসার দীর্ঘদিন পর্যন্ত বেশ ভালরকমের বিক্রিটিক্রি হত, উপার্জনও কোন অংশে কম হত না। কিন্তু বাংলায় একটা কথা আছে না, সুখে থাকতে ভূতে কিলায়, আমার হলো সেই দশা। সাহিত্যের মূল ধারায় নাম লেখানোর জন্যে ভূতের গপ্পো ছেড়ে ধরলাম সামাজিক নাটক। কী লিখেছি বলতে পারব না, তবে পরপর তিনটা বই বাজারে মুখ থুবড়ে পড়লেও সামাজিক নাটক লেখার জজবা বিন্দুমাত্র কমেনি আমার। ‘ভূত’ পত্রিকার সম্পাদক কয়েক সপ্তাহ আগে আমাকে তাঁর অফিসে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘শুনুন, জুনায়েদ সাহেব, ওইসব ভারি ভারি কথার সাহিত্য আপনাকে দিয়ে হবে না। আপনি যে লাইনের লোক সে লাইনেই আসুন। সামনের মাসের ঈদ সংখ্যার জন্যে আপনি একটা বেশ জমজমাট ভৌতিক উপন্যাস লিখে ফেলুন। দেখবেন, বাজারে আবার কাটতি বেড়ে যাচ্ছে।’
আমি গম্ভীর গলায় বললাম, ‘রহস্য টহস্য লিখতে ভাল লাগে না। সিলি সিলি সব বিষয় নিয়ে মাতামাতি করাটা অতি বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পড়ে।’
ভদ্রলোক গলা খাঁকরে বললেন, ‘কিন্তু পাবলিক ডিমাণ্ড বলেও তো একটা ব্যাপার আছে। কত চিঠি এসেছে জানেন? সব চিঠির ওই একই কথা—জুনায়েদ হায়দার পাশার জমজমাট ভূতের গল্প চাই। তা ছাড়া আপনার নিজের বাজার দরটাও তো দেখতে হবে। জনপ্রিয়তার গ্রাফ যেভাবে নামছে তাতে তো…’
আমি খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললাম, ‘নতুন করে একটা লিখতে বলছেন?’
‘বিজ্ঞাপনটা খালি কল্পনা করুন—আসছে ঈদসংখ্যায় জুনায়েদ হায়দার পাশার সম্পূর্ণ নতুন ভৌতিক উপন্যাস, দীর্ঘ তিনবছর পর আবার লিখলেন এককালের ভৌতিক সম্রাট।’
‘দয়া করে শেষের কথাটা লিখবেন না। শুনতে অসহ্য লাগে।’
সম্পাদক সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, ‘তা হলে ওসব বাদ দিয়ে শুধু হরর কিঙ লিখলে কেমন হয়? ইংরিজি কথা তো, একটা বেশ ইয়ে আছে।’
আমি ভদ্রলোককে কথা দিয়ে ফেললাম যে এবারের ঈদে দীর্ঘদিন পর আমার নতুন একটা হরর উপন্যাস যাচ্ছে।
রিটার্ন অভ দি হরর কিং জুনায়েদ হায়দার পাশা।
আর সমস্যার শুরুটা এখান থেকেই।
নিরিবিলিতে লেখালেখি করার জন্যে শহরতলির কাছে মাসখানেকের জন্যে একটা বাসা ভাড়া করলাম। আগের বাসায় লোকজন অনেক, কাজে খুব ব্যাঘাত হয়। এখানে লোকজন তেমন একটা পরিচিত নেই, কাজেই সমস্যা হবার কথা নয়। একটা ছোকরা চাকর রেখে দিয়েছি, সারাদিন থেকে রান্নাবাড়ি করে রাতে চলে যায়। আমি সারারাত টাইপ রাইটারে খটাখট শব্দ তুলে গল্প লেখার চেষ্টা করি। তবে দু’তিন দিনের মাথায়ই বুঝতে পারলাম আমার অবস্থা খারাপ। যা লিখছি, তাকে কোনভাবেই সুসাহিত্য বলা যায় না। ছাই ভস্মও বোধহয় এরচেয়ে ভাল। রাগে আমার মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে। সারারাত জেগে থেকে গলদঘর্ম হয়ে শেষরাতের দিকে ঘুমাতে যাই। নিরুপদ্রব ঘুমও হয় না। নানান আজেবাজে স্বপ্ন দেখে দিনের বেলায় ঘুম ভাঙে।
যে বাড়িটা ভাড়া নিয়েছি তার চারদিকটা বেশ সুন্দর। বাড়ির সামনে পিছনে অনেকখানি খোলা জায়গা, তাতে হরেক রকমের গাছটাছ আছে। তবে যত্নের অভাবে জায়গাটা জঙলা হয়ে গেছে। বাড়ির মালিকের একসময় হয়তো বাগান করার শখ ছিল, পরে কোন কারণে উৎসাহে ভাটা পড়ে যায়। অবশ্য জঙলা হলেও জায়গাটা আমার ভালই লাগে। বিশেষত দিনের বেলা যখন সূর্যের আলো বড়বড় নারিকেল গাছগুলোর ওপর পড়ে তখন কল্পনা করে নিতে ভাল লাগে যে আমি জঙ্গলের মধ্যে বসে আছি। তবে রাতের বেলা বাড়ির কম্পাউণ্ডটার দিকে তাকালে একটু গা ছমছমই করে বটে। শত হলেও এতবড় একটা নির্জন বাড়ি, তার ওপর আমি ছাড়া দ্বিতীয় কোন প্রাণীটি তো রাতের বেলা থাকে না—যৎসামান্য ভয় লাগাটাই স্বাভাবিক। অবশ্য গোটা ব্যাপারটা আমি রীতিমত উপভোগ করার চেষ্টা করি। হরর গল্পের লেখকের জন্যে এটাই তো উপযুক্ত পরিবেশ।
দুপুরে ভাত খাওয়ার পর কাগজ কলম নিয়ে একটু বসেছি, শব্দ পেয়ে মুখ তুলে দেখি আমার ছোকরা কাজের ছেলেটা তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে শোবার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার বয়স পনেরো ষোলোর বেশি হবে না, মোটামুটি বুদ্ধিও রাখে।
‘কিছু বলবি নাকি রে?’
‘আপনের সাথে দেখা করার জন্যে চশমা পরা এক সাব আসছে। নাম জিগাইছি কয় না।’
আমি বুঝলাম কে এসেছে। লোকটার নাম হচ্ছে মোহাম্মদ মুক্তাদির, গতকালই আলাপ হয়েছে, আমার রহস্য গল্পের যাকে বলে সিরিয়াস ভক্ত। আমি কেন রহস্য রোমাঞ্চ লাইন ছেড়ে দিয়েছি এ বিষয়ে প্রথমে খুব আক্ষেপ করলেন ভদ্রলোক। কিন্তু পরে যখন তাঁকে বললাম যে আমি আবার নতুন করে ওসব শুরু করতে যাচ্ছি, তখন যারপর নাই খুশি হলেন। বললেন, তাঁর কাছে নাকি এমন একটা জিনিস আছে যেটা দেখলে আমি রীতিমত অবাক হয়ে যাব। কী জিনিস জানতে চাইলে বললেন আগামীকাল বাড়িতে এসে দেখিয়ে দিয়ে যাবে। সত্যি বলতে কী, এই লোকটাকে কেন জানি উপদ্রব বলে মনে হচ্ছে না। তাই আর না করিনি, ভদ্রলোককে বাড়িতে আসতে বলে দিয়েছিলাম।
‘ওনাকে ড্রইংরুমে বসা। আমি আসছি।’
‘আচ্ছা, মামা।’
ছেলেটি চলে যাবার পর আমি আলনা থেকে হাত বাড়িয়ে পাঞ্জাবিটা নিয়ে গায়ে চাপালাম। বসার ঘরে গিয়ে দেখি সোফার ওপর আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছেন মোহাম্মদ মুক্তাদির। ভদ্রলোকের বয়স চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশের বেশি হবে না, দেখতে যদিও বৃদ্ধের মত লাগে। এখন সময়টা মার্চ মাস, বেশ গরম আবহাওয়া, কিন্তু ভদ্রলোক দেখি এর মধ্যেও কোট-মাফলার চাপিয়ে বসে আছেন। আমাকে দেখে মোহাম্মদ মুক্তাদির দাঁড়িয়ে গেলেন।
‘আরে বসুন, বসুন। তারপর খবর বলুন। সেদিনের পর তো ভাবলাম আর আসবেন না।’
‘কী যে বলেন? আপনার মত বিখ্যাত একজন রাইটার আমার সাথে আগ্রহ নিয়ে কথা বলছেন, এই তো আমার পরম পাওয়া।’ অত্যন্ত বিনয়ী ভঙ্গিতে বললেন ভদ্রলোক।
‘চা চলবে তো?’
‘সার্টেনলি।’
আমি আমার ছোকরা চাকরটিকে ডেকে চায়ের ফরমাস দিলাম। মোহাম্মদ মুক্তাদির সোফায় নড়েচড়ে বসে বললেন, ‘গতদিন বলেছিলাম না যে একটা মজার জিনিস আপনাকে দেখাব? আজকে সেটা নিয়ে এসেছি। এই যে…’ ভদ্রলোক হাতে ধরে থাকা এ ফোর সাইজের খামটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। খামটা খুলে দেখি ভেতরে একতাড়া ফুলস্কেপ কাগজ। সবচেয়ে উপরের কাগজে খুদে খুদে টাইপের অক্ষরে লেখা: ‘ছায়াবৃত্ত’ আর তার নীচে লেখা আমার নাম, জুনায়েদ হায়দার পাশা।
‘আরে এটা তো দেখি আমারই লেখা ম্যানুস্ক্রিপ্ট! এ জিনিস কোথায় পেলেন?’
‘সনটা বুঝতে পারছেন?’
‘অবশ্যই। লেখাই তো রয়েছে। মার্চ, নাইনটি এেইট এেইট।’
ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘কী ভাই? ভাল সারপ্রাইজ না?’
আমার বিস্মিত হবার পালা এখনও শেষ হয়নি। বুঝতে পারছি না এই লেখা এনার কাছে গেল কীভাবে? একজন প্রায় অচেনা লোকের কাছে আমার বহুদিন আগে লেখা পাণ্ডুলিপি দেখতে পাব এ স্বপ্নেও ভাবিনি। কয়েকটা পাতা উল্টে দেখতে লাগলাম।
‘এটা কীভাবে পেলাম সেটা একটা রহস্য হিসাবেই না হয় তোলা থাকুক, কী বলেন?’
‘এই ম্যানুস্ক্রিপ্টটা আমারই লেখা সন্দেহ নেই। তবে ঠিক মনে করতে পারছি না কী লিখেছি।’
‘তো অসুবিধা কী? আমি গোটাটা পড়ে দেখেছি। ফার্স্ট ক্লাস লেখা। আমার বিশ্বাস আপনি যদি এই গল্পটা লিখে শেষ করতে পারেন তা হলে আবার বাজিমাত হয়ে যাবে। জুনায়েদ হায়দার পাশার রাজসিক প্রত্যাবর্তন।’
আমি গাল চুলকে বললাম, ‘সমস্যা হচ্ছে এই গল্পটা আমি আর লিখতে পারব না।’
‘কেন?’
‘আমি অন্যের লেখা প্লট নিয়ে কাজ করি না। আমার সম্পূর্ণ নীতিবিরুদ্ধ।’
‘কিন্তু এটা তো আপনারই লেখা?’
আমি হেসে বললাম, ‘আমার লেখা হতে পারে, কিন্তু আমি তো, ভাই, শিওর না। মনেই করতে পারছি না কবে কখন লিখেছি। কাজেই এটাকে আমার লেখা বলে মেনে নিতে একটু প্রবলেম থাকাটাই স্বাভাবিক, কী বলেন?’
আমার কথা শুনে বুঝতে পারছিলাম মুক্তাদির সাহেব একটু অস্বস্তি বোধ করছিলেন। এটাই স্বাভাবিক। আমি পরিস্থিতি হাল্কা করার জন্যে বললাম, ‘কিন্তু, ভাই, এটা না মেনে পারছি না যে আপনি আমায় দারুণভাবে চমকে দিয়েছেন। থ্যাঙ্ক ইউ, সার।’
ভদ্রলোক আমার কথা শুনে হাসার চেষ্টা করলেন। তবে এরপর আর আলাপ খুব একটা ভাল জমল না। চা খাওয়ার ঘণ্টাখানেক পর উনি বিদায় নিলেন। আমিও শোবার ঘরে গিয়ে বিছানায় একটু গড়াগড়ি দেব ভাবলাম। সন্ধ্যার পর আবার লিখতে বসতে হবে।
সেদিন সন্ধ্যায় প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হলো। সময়টা মার্চ মাস হলেও ঝড়ের তাণ্ডব দেখে মনে হচ্ছে কালবৈশাখীর ঠাকুরদাদা। আমার বাড়ির কম্পাউণ্ডের প্রত্যেকটা গাছ এমনভাবে দুলে উঠছে যেন কিছুক্ষণের মধ্যেই ওগুলো শেকড়সুদ্ধ উপড়ে যাবে। বাইরে থেকে ঝড়ো হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দ আসছে। লম্বা টানা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি কিছুক্ষণ বৃষ্টি উপভোগ করলাম। কিছুক্ষণ পর কাজের ছেলেটা এসে বলল যে তার চলে যাবার সময় হয়েছে, আমি যেন নীচে নেমে গেট লাগিয়ে দিয়ে আসি।
‘কীরে, ব্যাটা, এই তুফানের মধ্যে বাসায় যাবি কীভাবে? রাতটা এখানেই থেকে যা।’
ছেলেটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। বোঝাই যাচ্ছে আমার প্রস্তাব তার পছন্দ হয়নি। সে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মেঝেতে কীসব আঁকিবুঁকি করতে লাগল।
‘কীরে, কিছু বল, গাধা।’
ছেলেটি অনেকক্ষণ পর দম নিয়ে বলল, ‘এই বাড়িতে রাইতে থাকনের নিষেদ আছে।’
‘মানে?’
‘মায়ে কইছে এই বাড়িত জিন আছে, খুব খারাপ জিন। রাইতের বেলা থাকলে জানে মাইরা ফেলব।’
‘সাংঘাতিক ব্যাপার তো?’
ছেলেটি কোন জবাব দিল না। আড়চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক সেদিক দেখল, কেউ তার কথা শুনে ফেলল কিনা বোঝার চেষ্টা করছে। আমি লক্ষ করলাম তার চোখেমুখে এক ধরনের শক্ত আতঙ্ক বিরাজ করছে। সে মোটামুটি আন্দাজ করা যায় রাতে এ বাড়ি ত্যাগের বিষয়ে বদ্ধপরিকর।
‘আমি তো তিন চারদিন ধরে এখানে আছি, জিন ভূত আমাকে ধরল না কেন?’
ছেলেটি ইতস্তত করে বলল, ‘মামা, আমারে যাইতে দেন। রাইত হয়া আসতাছে।’
‘আগে ঠিক করে বল তুই নিজে কি কোনকিছু টের পেয়েছিস?’
‘আমি নিজ চোক্ষে কিছু দেখি নাই। তয়…’
‘তয় কী?’
‘একদিন বাড়িত ফিরতে সন্ধ্যা লাগছিল। গেটের তালা খুইলা বাইরে বার হওনের সময় মনে হইল আমার পেছনে কেউ দাঁড়ায়া আছে। আমি সাথে সাথে পেছনে তাকাইলাম। কেন জানি মনে হইল কেউ আমারে আড়াল থেইকা নজর করতাছে। খুব খারাপ কেউ। আমি তাড়াতাড়ি গেট খুইল্যা চইলা যাই।’
‘তুই এত ভয় পাস তাও এই বাড়িতে কাজ করিস কেন?’
‘দিনের বেলা কোন ভয় নাই। মায়ে কইছে রাইতের আগে এই জায়গা ছাইড়া আইতে।’
‘তুই তো, ব্যাটা, বেশ মাতৃভক্ত মনে হচ্ছে। আচ্ছা তোর থাকা লাগবে না, চলে যা।’
আমি একটা ছাতা সঙ্গে নিয়ে নীচ পর্যন্ত এগোলাম। একতলার লম্বা করিডরটা পার হবার সময় মনে হলো এতবড় এবং এত পুরানো একটা বাড়িতে, বিশেষত যেখানে একটি বৈ দুটি প্রাণী থাকে না, সেখানে অন্ধকার নামলে একটু গা ছমছম করাটাই স্বাভাবিক। আর ছেলেটির বয়সও তো দেখতে হবে।
আমি গেট লাগিয়ে দিয়ে উপরে চলে এলাম। এই বাড়িটা আসলেই অদ্ভুত। দোতলাটা, যেখানে আমি থাকি, চমৎকার জায়গা। আদ্যিকালের মত লম্বা টানা বারান্দা, বিশাল বিশাল একেকটা বাথরুম, তাতে অনায়াসে ফুটবল খেলা যায়। প্রত্যেকটা ঘর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতায় যাকে বলে দশাসই। অথচ একতলাটা দেখলে রীতিমত হতাশ হতে হয়। বিশাল একটা গোডাউনের মত জায়গা। ভেতরের সব দেয়াল ভেঙে ফেলে লম্বা একফালি জায়গা বের করা হয়েছে, যতদূর জানি ওটা একটা লোকাল ওষুধ কোম্পানির ভাঁড়ার ঘর, যদিও এ কয়দিনে কাউকে আসতে দেখিনি। বিশাল এক তালা ঝুলছে একতলার সদর দরজায়।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির তেজও বেড়ে চলল। আমি বারান্দার দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ করে ঘরে গিয়ে বসলাম। টাইপরাইটারটা বিছানার ওপর নিয়ে বসা মাত্রই লক্ষ করলাম একতাড়া ফুলস্কেপ কাগজ কে যেন বালিশ চাপা দিয়ে রেখেছে। ছায়াবৃত্তের সেই ম্যানুস্ক্রিপ্টটা।
ভদ্রলোককে তো সাফ বলে দিয়েছি যে এই প্লট থেকে গল্প লেখা সম্ভব না। তাঁর তো এটা নিয়ে যাবারই কথা। উনি কি ভুলে জিনিসটা ফেলে গেছেন আর আমার ছোকরা চাকরটি ওটাকে আমার লেখা ভেবে ঘরে এনে রেখেছে?
ম্যানুস্ক্রিপ্টটাকে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলাম। প্রথম যে চ্যাপ্টার লেখা হয়েছে তার কয়েকটা লাইন পড়তেই টের পেলাম অত্যন্ত জমজমাট একটা গল্পের স্টার্টিং হয়েছে। ঠিক মত লিখে শেষ করতে পারলে পাঠকমহলে আলোড়ন পড়ে যাবে। সত্যি বলতে কী মনের ভেতর একটু খুঁতখুঁত লাগছে। নিজের সাম্প্রতিক লেখা কাগজগুলোর দিকে চোখ গেল। কুসাহিত্য ছাড়া ওগুলোকে আর কিছু বলা যায় না। অথচ ছায়াবৃত্ত নামে আমারই সতেরো বছর আগেকার লেখাটা দেখলে চোখ জুড়িয়ে আসে। গল্পটা আসলে এক তরুণকে নিয়ে লেখা। ছেলেটা একটা ভুতুড়ে বাড়িতে আটকে পড়ে। আটকে পড়ার কারণটা অবশ্য একটু ছেলেমানুষি হয়ে যায়। তবে সমস্যা নেই। ভূতের গল্পে লোকে এতকিছু খেয়াল করে না। তারপর একে একে ঘটতে থাকে ভয়াবহ সব ঘটনা। সব ঘটনার শুরু হয় একটা টেলিফোন কল থেকে। ছেলেটা রাতের বেলা একটা মিস্টিরিয়াস ফোনকল পায়। তারপর…
রিরিরিরিরঙঙঙঙঙঙঙ!
আমার মোবাইল ফোনটা আচমকা বাজতে শুরু করেছে।
চমকে উঠে আরেকটু হলে বিছানা থেকে পড়ে যাচ্ছিলাম। নিজেকে সামলে নিলাম। বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে একেবারে। একেই বোধহয় বলে কোইনসিডেন্স! নম্বরটা দেখলাম। আমার সম্পাদক সাহেব।
‘হ্যালো।’
‘কী, ব্রাদার, খবর কী? শুনলাম ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামগঞ্জে আশ্রয় নিয়েছেন? লেখালেখির অবস্থা কেমন?’
‘ভালই। আপনি কোথেকে বলছেন বলুন তো? লাইনটা বেশ ডিস্টার্ব করছে।’
‘নেত্রকোনা, ভাই। শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এসেছি। ভাবলাম আপনি কী করছেন খবর নিই।’
‘মেনি মেনি থ্যাঙ্কস। এখানে অবশ্য প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। আগামীকালকের আগে থামবে বলে মনে হয় না…’ কথাটা বলেই থেমে যেতে হলো। মোবাইলে বিপ বিপ শব্দ হচ্ছে, এর অর্থ আরেকটা কল এসেছে। আমি সম্পাদক সাহেবকে ওয়েটিঙে রেখে কলটা রিসিভ করলাম।
‘হ্যালো।’
ওপাশে কোন শব্দ নেই। ভাল করে কান পাতলাম। খুব অস্পষ্টভাবে খসখস শব্দ কানে আসছে।
‘হ্যালো, হ্যালো…’
খুট করে লাইনটা কেটে দিল কেউ। আমি আবারও সম্পাদক সাহেবের কলটা রিসিভ করতে গেলাম। ভদ্রলোক ওপাশে নেই। ফোন রেখে দিয়েছেন।
আমি বুঝতে পারলাম না কী করব? এটা কি কোনধরনের কোইনসিডেন্স, নাকি…? বিছানার ওপর পড়ে থাকা ম্যানুস্ক্রিপ্টটার দিকে চোখ পড়ল আবার। কয়েকটা পাতা দ্রুত উল্টে গেলাম। দেখি লেখা রয়েছে—
‘খুব ভয় পাচ্ছি আমি। বাইরে বৈরি আবহাওয়া, অসহনীয় ভেতরকার পরিবেশ। টেলিফোনটা যে কেন ধরলাম? আগে যদি জানতাম তবে এ ভুল কখনও করতাম না। আমার মনে যত অন্ধকার আছে সব যেন আমায় আজ চেপে ধরতে বসেছে। এই ভয়াবহ আদিম নিঃসঙ্গতা আর সহ্য করতে পারছি না। যোগাযোগের সমস্ত পথ বন্ধ। কারও সাথে যে যোগাযোগ করব তারও উপায় নেই। টের পাই নিকষ কালো আঁধার ধেয়ে আসছে আমার দিকে, মৃতের ছায়া চারপাশে অনুভব করি। হে, ঈশ্বর, রক্ষা করো আমায়।’
যোগাযোগের সমস্ত পথ বন্ধ! এর অর্থ কী? জানি যা ঘটেছে তাকে একটা ছোট্ট কোইনসিডেন্স ছাড়া আর কিছু বলা উচিত না। ম্যানুস্ক্রিপ্টের পরের পাতায় যা যা লেখা আছে তার সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজতে যাওয়াটা বোকামি হবে—নিজেকে বোঝালাম। তা ছাড়া আমার তো বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের সব পথই খোলা। এই তো চোখের সামনে আছে মোবাইল ফোন, নিমিষেই পৃথিবীর যে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে। সবচেয়ে বড় কথা আমি যদি ইচ্ছা করি তা হলে অল্পক্ষণের ভেতরই কম্পাউণ্ডের গেট খুলে বাইরে যেতে পারব। সেখানে সম্পূর্ণ লৌকিক এবং স্বস্তিকর পরিবেশ অপেক্ষা করছে আমার জন্যে।
তবে, মিথ্যা বলব না, আমার কেন জানি একটু একটু ভয় করতে আরম্ভ করেছে। আমি জানি এর সবটাই ভীষণ রকমের অমূলক। কিন্তু তারপরও মনের গভীরে কুডাক ডাকতে আরম্ভ করে দিয়েছে।
মোবাইল ফোনটা আবার তুলে নিলাম। লো ব্যাটারি সিগনাল দেখাতে শুরু করেছে। কুছ পরোয়া নেহি। কাছেই আছে চার্জার, দু’তিন মিনিট চার্জ পেলেই অন্তত খানতিনেক কল করা যাবে। কিন্তু তার আগে কাজ আছে। আমি পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করলাম। মোহাম্মদ মুক্তাদির আজ দুপুরেই এটা আমাকে দিয়েছেন। এই অপরিচিত জায়গায় ওনার মত একজন প্রতিবেশী পেয়েছি ভাবতেও মনে স্বস্তি আসে। লোকটাকে ফোন করব কারণ সবার আগে জানা দরকার এই ম্যানুস্ক্রিপ্ট সত্যি সত্যি তিনি পেলেন কীভাবে? অস্বীকার করব না এই একটা সামান্য কাকতালীয় ব্যাপার আমাকে একটু নাড়িয়ে দিয়েছে।
আমি নম্বরটা ডায়াল করলাম। রিঙ হলো খানিকক্ষণ, ফোনটা রিসিভ করল অল্পবয়সী কোন একটি মেয়ে!
‘হ্যালো, মুক্তাদির সাহেব আছেন? মোহাম্মদ মুক্তাদির।’
‘হ্যালো, আপনি কে বলছেন?’ মিষ্টি রিনরিখে গলায় বলল মেয়েটি। বাইরের ঝড়ের প্রভাব মোবাইলের ফোনে শব্দ শুনতে একটু কষ্ট হচ্ছে। ফ্রিকোয়েন্সিতেও পড়েছে মনে হয়।
‘আমি ওনার বন্ধু। একটু দেয়া যাবে তাঁকে?’
‘একটু ধরুন,’ বলে মেয়েটি ফোন রেখে কাকে যেন ডাকতে গেল।
আমি যথাসম্ভব শান্ত থাকার চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ পর কেউ ফোন ধরল।
‘হ্যালো, মুক্তাদির সাহেব?’
‘না, সরি। আমি ওনার মিসেস বলছি,’ বয়স্কমত একজন মহিলার কণ্ঠস্বর ভেসে আসল ওপার থেকে। সম্ভবত মুক্তাদিরের মেয়ে ফোন ধরেছিল, বাপ হয়তো বাসায় নেই তাই মাকে ফোন দিয়ে দিয়েছে।
‘উনি বাসায় নেই?’
ভদ্রমহিলা ওপাশ থেকে কিছুটা অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, ‘ভাই, আপনি কি বিদেশে থাকেন?’
‘নাতো।’
‘মানে আপনি কি খবরটা জানেন না?’
‘কী খবর।’ রীতিমত গলা কাঁপতে আরম্ভ করেছে আমার।
‘মুক্তাদির মারা গেছে তিন বছর আগে, আর আপনি কিনা বলছেন…’
আমি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম তখনই মোবাইলটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে অফ হয়ে গেল। খানিকক্ষণ বোকার মত ‘হ্যালো হ্যালো’ করলাম। সত্যি বলতে কী আমার মাথা কেন জানি ঘুরতে আরম্ভ করে দিয়েছে। অথচ এসময় তো চেতনা হারালে চলবে না।
আমি মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করতে লাগলাম। এখনও পর্যন্ত ভয়ঙ্কর কোনকিছুই ঘটেনি। মোহাম্মদ মুক্তাদির নামের লোকটা সম্পূর্ণ বানোয়াট হতে পারে। লেখকদের ভয় দেখিয়ে অনেকেই একধরনের বিকৃত আনন্দ পেয়ে থাকে—লোকটাও হয়তো সেরকমের কেউ। আর ম্যানুস্ক্রিপ্ট পড়া মাত্র ফোন আসার ব্যাপারটা নেহায়েতই কাকতালীয়! উফ, ভাবতে অবাক লাগে এরকম ভয়াবহ গল্পের প্লট নিয়ে নিজেই এসব জিনিস লিখেছি, তাও আবার আজ থেকে সতেরো বছর আগে। যাই হোক, এখন প্রধান কর্তব্য হচ্ছে মোবাইলটা চার্জে দেয়া এবং তারপর আমার সম্পাদককে ফোন করা। কারও সঙ্গে কথা বলে মনের উদ্বেগ কাটাতে হবে।
আমি ড্রয়ার টেনে চার্জারটা বের করলাম। আমার শোবার ঘরের দেয়ালেই লাগানো আছে সুইচ বোর্ড। হাত বাড়িয়ে সকেটে অ্যাডাপ্টার লাগানো মাত্রই প্রচণ্ড জোরে ধারে কাছে কোথাও বাজ পড়ার শব্দ হলো, সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ জুড়ে নেমে এল নিকষ কালো অন্ধকার। ইলেকট্রিসিটি ফেইলর।
‘…যোগাযোগের সমস্ত পথ বন্ধ। টের পাই নিকষ কালো আঁধার ধেয়ে আসছে আমার দিকে, মৃতের ছায়া চারপাশে অনুভব করি। হে, ঈশ্বর, রক্ষা করো আমায়।’
হতভম্ব হয়ে অন্ধকারের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। স্পষ্ট বুঝতে পারছি যা আমি কাকতালীয় বলে মনে করছি আসলে সেরকম কিছু নয়। ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে আমাকে ঘিরে, এ তারই পূর্বাভাস। আমার পকেটে সবসময় দিয়াশলাই থাকে, ধূমপায়ীদের এই একটা সুবিধা। আমি কাঠি জ্বেলে আগুন ধরালাম। ড্রয়ারের ভেতর এক বাক্স মোমবাতি আছে, গতকালই কেনা হয়েছে। দু’তিনটা মোম জ্বালিয়ে ঘরের অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করলাম। অন্ধকার দূর তো হলোই না বরং আরও জমাট বেঁধে গেল। কাঁপা হাতে যথাসম্ভব দ্রুত হ্যাণ্ডব্যাগটা টেনে প্রয়োজনীয় কিছু কাপড় আর টাকা সঙ্গে নিয়ে নিলাম। কর্তব্য আমি স্থির করে ফেলেছি, এই পোড়ো বাড়িতে আর না। যদিও জানি যা ঘটছে তার সবটাই হয়তো শক্তিশালী কোন কাকতালীয় ব্যাপার। কিন্তু আমি মিথ্যামিথ্যি ভূতের গল্পের নায়কের মত অত দুঃসাহসী নই। কাজ নেই অযথা বাড়তি উত্তেজনা নেবার। মোবাইল আর চাবির গোছাটা নিয়ে নীচতলার দিকে রওনা হলাম। রওনা দেয়ার আগে একবার জানালার শার্সি দিয়ে বাইরে তাকালাম। তুমুল ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আজ রাতে বাড়ির বাইরে বের হবার কোন পরিবেশই আর নেই।
আমি দোতলার সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতে লাগলাম। একটানা বৃষ্টির শব্দ আর মাঝে মাঝে ঝড়ো হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া কোন শব্দ কানে আসছে না। একতলায় নেমে পোর্চের কাছাকাছি আসা মাত্রই কেন জানি মনে হলো পেছনে কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ালাম।
কেউ কোথাও নেই।
‘জুনায়েদ হায়দার, কাম ডাউন। অতি উত্তেজনার ফলে তোমার স্নায়ু দুর্বল হয়ে যেতে আরম্ভ করেছে। তুমি হ্যালুসিনেট করতে শুরু করছ। এখন সাধারণ যেকোনো শব্দ তোমার কাছে ভয়ংকর মনে হতে পারে। অতএব, কাম ডাউন। ঠাণ্ডা মাথায় কম্পাউণ্ডের গেট খুলে বের হও। তারপর একটা রিকশা নিয়ে সোজা ভোঁ দৌড়। আর কোনদিন এই বাড়ির ত্রিসীমায় মাড়াবে না। আর যদি সম্ভব হয় ওই পাণ্ডুলিপিটা পুড়িয়ে ফেলো। যত সমস্যার মূলে ওই অভিশপ্ত জিনিসটাই।’
নারিকেল আর কাঁঠাল গাছটা পেরিয়ে মূল ফটকের কাছে চলে এলাম। বড়বড় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে সারা গা ভিজে চুপসে গেছে। ত্রস্ত হাতে চাবি ঢুকালাম কি হোলের ভেতর। কট করে একটা শব্দ হলো। চরম আতঙ্কের সঙ্গে লক্ষ করলাম চাবির এক অংশ আমার হাতে, বাকি অংশটা তালার ভেতরেই রয়ে গেছে। পাগলের মত তালা ধরে ঝাঁকাঝাঁকি করলাম। পুরানো আমলের বড় তালা, মচকানোর কোন সুযোগই দিল না।
আমার মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে। এখন একমাত্র লক্ষ্য কী করে এই ভয়াবহ বাড়িটা ত্যাগ করা যায়। গোটা বাড়িটাকেই দুর্গের মত ঘিরে রেখেছে বড় বড় পাঁচিল। প্রায় চার মানুষ সমান হবে তার হাইট। পাঁচিলের মাথায় সারি সারি করে জঙ ধরা পেরেক গাঁথা আছে। আমার শরীরের যে ওজন তাতে ওই পাঁচিল ডিঙানো সম্ভব না। আমি প্রাণপণে লোহার গেট ধরে ঝাঁকাতে লাগলাম। এদিকে আকাশ ভেঙে পড়ছে মাথার ওপর। প্রচণ্ড ঝড়জলের শব্দ ছাপিয়ে আমার শব্দ পৌঁছতে পারবে কোন মানুষের কানে?
কিছুক্ষণ পরেই বুঝতে পারলাম আমার আশা দুরাশা। এইরকম দুর্যোগময় রাতে আমার শব্দ কার কানে পৌঁছবে? গেটের আশপাশে কোন ফাঁকফোকর আছে কিনা দেখার জন্যে এদিক সেদিক খুঁজতে লাগলাম। কাদায় সারা শরীর ভরে গেল, কাঁটা ঝোপে লেগে কেটে গেল সর্বাঙ্গ। কিন্তু, এ বাড়ি থেকে বের হবার কোন উপায় খুঁজে পেলাম না। কাল সকালের আগে কি বের হওয়া যাবে না এখান থেকে?
ক্লান্তি ও অবসাদে ভরে গেল আমার মন। এদিকে বৃষ্টিতে ভিজে জবজব করছে গায়ের পোশাকগুলো। পেছনে অন্ধকারের মধ্যে থমথমে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নির্জন বাড়িটা। প্রচণ্ড বৃষ্টি পড়ায় চারদিক ধোঁয়াটে কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। স্পষ্ট বুঝতে পারছি এই দুর্যোগের রাতে ওই একটা স্থানেই থাকতে হবে আমার, এর অন্যথা হবার কোন উপায়ই নেই। ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে গেলাম শরীরটাকে ওই বাড়িটার ভেতর।
এখনও বাতি ফিরে আসেনি। আর আসবে কি না কে জানে? পোর্চের কাছে মোমবাতি আর দিয়াশলাই ফেলে গিয়েছিলাম। মোমবাতি জ্বেলে সিঁড়ি বেয়ে ক্লান্তভাবে দোতলায় উঠতে লাগলাম। আবার সেই পুরনো ভয়টা ফিরে ফিরে আসছে। লম্বা করিডরটা পার হবার সময় একবারও পেছন ফিরে তাকালাম না। শোবার ঘরে ঢুকে দরজার খিল এঁটে দিলাম। ড্রয়ার খুলে মোমবাতির বাক্সটা বের করে গুনে দেখলাম মোটে তিনটা স্টিক আছে। আজকের রাতটা কি কোনমতে চলে যাবে? আমি এখন মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছি যে আজ আর ইলেকট্রিসিটি ফেরত আসবে না।
ভেজা পোশাক পাল্টে বিছানার ওপর চাদর টেনে বসলাম, হাতে টেবিলের ওপর থেকে নেয়া সেই ম্যানুস্ক্রিপ্ট। এখনও মনে করতে পারছি না সত্যিই এটা আমি লিখেছি কি না? মনটাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করতে লাগলাম। সব ঘটনা যদি বিবেচনা করি তা হলে বলতে হবে এখনও পর্যন্ত আক্ষরিক অর্থে কোন অতিপ্রাকৃত কিছু ঘটেনি। টেলিফোন আর চাবি ভাঙার ব্যাপারটা হয়তো আসলেই কাকতালীয় ঘটনা, আমার স্নায়বিক উত্তেজনার ফল। তবে মোহাম্মদ মুক্তাদির নামের লোকটার শয়তানিটা মনে পড়লে ভীষণ রাগ লাগছে। এমন জঘন্য রসিকতা কেউ করতে পারে? একবার এই ঝামেলা থেকে উদ্ধার পাই তারপর শালাকে একহাত দেখে নেয়া যাবে, মনে মনে বললাম আমি। রাগ ওঠাতে মন থেকে ভীতিকর ভাবটা একটু কেটে গেল। ম্যানুস্ক্রিপ্টটার দিকে নজর দিলাম।
‘মন থেকে ভয় কাটানো সহজ নয়, তবু আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। রহস্যময় ফোনকলটার কথা ভুলে যেতে চাই। অন্ধকারটা অসহনীয় লাগছে। হাত পা গুঁজে বসে থাকলেও কেন জানি মনে হচ্ছে অশুভ আত্মাটা আমার খুব কাছেই আনাগোনা করছে। বাতাসে ওর উপস্থিতির কটু গন্ধটা নাকে এসে লাগছে। ও কি এসে গেল আবার?’
পড়া বন্ধ করে নিজের অজান্তেই নাক দিয়ে বাতাসটা একটু শুঁকে দেখলাম। কীরকম একটা বাজে গন্ধ টের পাচ্ছি। অনেকটা শব পচা গন্ধ। হয়তো কাছে ধারে কোথাও ট্যানারি জাতীয় কিছু আছে, বৃষ্টি হওয়ায় তার থেকে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। আর ম্যানুস্ক্রিপ্টের লেখা পড়েই হয়তো আমার অবচেতন মন গন্ধটার অস্তিত্ব অনুভব করতে আরম্ভ করেছে। পৃথিবীতে ভৌতিক ব্যাপার বলে কিছু নেই। যত ভয়ঙ্করই হোক শেষটায় দেখা যায় সব কিছুর পেছনেই কেমন সহজ সব লজিক কাজ করছে। এই লজিকই হচ্ছে সব। লজিকবিহীন পৃথিবী অসম্ভব। অসম্ভব, অসম্ভব…
‘নিরাপদে আছি কি আমি? বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী এই নির্জন পোড়ো বাড়িতে বন্দি হয়ে থাকাকে কি নিরাপদে থাকা বলে? শবদেহের কটু গন্ধটা বাতাসকে ভারি করে ফেলছে। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই এক সাগর রক্তে ভেসে যাচ্ছে গোটা ঘর। হায় ঈশ্বর, এর থেকে নিষ্কৃতি কি আমি পাব না?’
কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম—ম্যানুস্ক্রিপ্টের লেখার সঙ্গে দুর্বল হলেও অন্তত একটা অমিল পাওয়া গেল। বাতাস ভারী করে ফেলার মত কোন গন্ধ অবশ্যই নাকে আসছে না। তা ছাড়া এখন বোঝা যাচ্ছে শবদেহের গন্ধ বলে যেটা মনে হচ্ছে সেটা নিশ্চিত ট্যানারি থেকে আসা গন্ধ। আমার দুর্বল মনই এসব ভীতিকর কল্পনা সৃষ্টির জন্যে দায়ী।
কতক্ষণ বিছানার ওপর একঠায় বসে ছিলাম তা মনে করতে পারব না। ম্যানুস্ক্রিপ্টটা পড়তে আর ইচ্ছা করছে না। ওটা আপাতত পেপার ওয়েট চাপা দিয়ে টেবিলের ওপর রেখে দেয়া হয়েছে। বৃষ্টি প্রায় থেমে গেছে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম বৃষ্টি কমলেও আকাশে ঘনঘন বিদ্যুৎ চমক থামেনি। মুহুর্মুহু চমকে উঠে যেন জানান দিচ্ছে দুর্যোগ এখনও কাটেনি। ঘড়ি দেখলাম। রাত তিনটা পাঁচ। ভোর হতে আরও অনেক বাকি।
এমন সময় ঝনঝন করে কাঁচ ভাঙার মত শব্দ হলো মাথার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে সজাগ হয়ে গেল আমার প্রতিটা ইন্দ্রিয়। কড়িকাঠের দিকে তাকানো মাত্রই বুঝতে পারলাম শব্দটা আসছে ছাদ থেকে। মনোযোগ দিয়ে শব্দটা শুনলাম। তফাৎটা তৎক্ষণাৎ ধরতে পারলাম। কাঁচ ভাঙার নয়, বরং বলা যায় কোন অল্পবয়সী মেয়ে নূপুর পায়ে দিয়ে এলোমেলো ভঙ্গিতে ছাদময় ঘুরে বেড়ালে যেরকম শব্দ হতে পারে, অনেকটা সেরকম। আমার কাজের ছেলেটার কথা মনে পড়ল।
‘এই বাড়িতে জিন আছে, খুব খারাপ জিন। রাইতের বেলা থাকলে জানে মাইরা ফেলব।’
ছাদের ওপর হঠাৎ ভারী একটা কিছু পড়ার আওয়াজ হলো। ধুপ! তারপর সব নিশ্চুপ, ব্যাঙের একটানা ডাক কানে আসছে কেবল।
আমি স্থির দৃষ্টিতে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে আছি। বুকের ভেতর ধুকপুকানি আরম্ভ হয়ে গেছে। ছাদে এই মুহূর্তে কী ঘটছে বলতে পারব না, জানার চেষ্টাও করতে পারব না। অনেকক্ষণ উপরে তাকিয়ে রইলাম। একসময় ক্লান্ত হয়ে এল দৃষ্টি, চোখের কোণ জ্বালা করতে লাগল। তবে আমার সদাসতর্ক ইন্দ্রিয়গুলো ক্ষণিকের জন্যেও শিথিল হলো না।
খাট থেকে নেমে বাথরুমের দিকে এগোলাম। ভাগ্যিস এই ঘরের সঙ্গে লাগোয়া বাথরুম আছে, নইলে কী দুর্দশা হত কে জানে? বেসিনে গিয়ে ট্যাপ খুলে চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিলাম। সঙ্গে আলো নিয়ে আসিনি তাই আয়নায় নিজের বিধ্বস্ত মুখখানা দেখতে পেলাম না। নিশ্চয়ই এক রাতের মধ্যেই আমার মাথার চুলের অর্ধেকটা পেকে গেছে।
বাথরুম থেকে বেরিয়েই বুঝতে পারলাম বাতাসে কটু গন্ধের মাত্রাটা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছে। আশ্চর্য, ঘরের দরজা জানালা সব বন্ধ, তবু গন্ধ আসছে কী করে? মাথার ওপরের ওই একটা ভেন্টিলেটর থেকে কি এত দুর্গন্ধ আসা সম্ভব? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর একমাত্র জানে কেবল ওই অভিশপ্ত ম্যানুস্ক্রিপ্টটা। কাগজগুলোতে কী লেখা তা পড়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই, জানি ভয়াবহ কিছু একটা লেখা আছে সেখানে। কাকতালীয়ভাবে হয়তো মিলেও যাবে আমার বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে। ওই জিনিস পড়ারও কোন দরকার নেই। কাগজগুলো নিয়ে দলা পাকিয়ে ফেলে দিতে যাব আর ঠিক ওই সময়ে আরেকটা শব্দ কানে এল। খুব অস্পষ্ট ও চাপা, কিন্তু পরিচিত।
নকিয়া মোবাইল ফোনের সেই সুপরিচিত অফিশিয়াল টিউন, আমার মোবাইলের রিঙটোন! এবং শব্দটা আসছে নীচতলা থেকে।
পকেটে হাত দেয়া মাত্র বুঝতে পারলাম মোবাইলটিকে আমি নীচতলায় সম্ভবত পোর্চের কাছে ফেলে এসেছি। কিন্তু ফোনটা বাজছে কেন? সামান্য চার্জ কি সে ফিরে পেয়েছে?
একটা অস্বস্তিকর দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। দরজা খুলে নীচে গিয়ে ফোনটা আনব, নাকি যেভাবে খিল এঁটে বসে আছি, ঠিক সেভাবেই থাকব? পরক্ষণেই আবার মনে হলো এমনও তো হতে পারে যে আমার সম্পাদক ফোনে আমাকে ধরার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এত রাতে উনি ফোন করবেন কেন? সেই অজ্ঞাতনামা ফোনকলটি নয়তো?
আমি প্রমাদ গুণলাম। কেন জানি মনে হচ্ছে ফোনটা নীচ থেকে উদ্ধার করে আনা দরকার। খাট থেকে নেমে দরজার খিল খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি থেমে গিয়ে চাঁদ উঠেছে আকাশে। জোছনার আবছা আলোয় ভরে গেছে গোটা বারান্দা।
আমার দৃষ্টি অবশ্য সিঁড়ির দিকে, সটান নেমে গেছে নীচতলায়। আমি সিঁড়িগুলোর কাছাকাছি আসা মাত্রই ফোন বাজা বন্ধ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ এক অস্বাভাবিক নৈঃশব্দ্যে ভরে গেল।
পা বাড়াব ভাবছি ঠিক ওই সময় চোখে পড়ল দৃশ্যটি। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম সারা সিঁড়ি জুড়ে অজস্র পায়ের ছাপ। তাজা রক্ত মাড়িয়ে এসেছে কেউ, তারপর গোটা বাড়ি পা টেনে টেনে হেঁটেছে। আতঙ্কে সারা শরীর অবশ হয়ে যেতে লাগল। কিন্তু কিছুতেই চেতনা হারানো যাবে না। আমি ক্রমশ পিছিয়ে এসে আমার শোবার ঘরের কাছে চলে এলাম। বিশাল টানা বারান্দার মোটা মোটা থামগুলোর আড়ালে নিশ্চয়ই কেউ লুকিয়ে আছে। সে কি মানুষ? নাকি অন্য জগতের কেউ?
শোবার ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই দরজার খিল এঁটে দিলাম। জানালাগুলো আগেই লাগানো ছিল, তারপরও সব ঠিকমত আছে কীনা দেখে নিলাম। বাথরুমের দরজাটা ভালমত লাগিয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। দরজার দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ, বুঝতে পারছি সারা শরীর রীতিমত ঘামতে আরম্ভ করেছে। কান খাড়া করে বারান্দায় কেউ হাঁটাহাঁটি করছে কীনা শোনার চেষ্টা করলাম। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। জানালার শার্সিতে পানি পড়ার মৃদু শব্দ কানে আসছে।
কী ঘটছে বলতে পারব না। কী শুনছি বলতে পারব না। টেবিলের ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে ম্যানুস্ক্রিপ্টটা নিলাম। আমি জানি এখানে আছে সব প্রশ্নের উত্তর।
‘সময় এখন স্থির। আমি চিরতরে বন্দি হয়ে গেছি। এই অন্ধকূপ থেকে আর কখনও বের হতে পারব না। একে একে স্থবির হয়ে আসছে আমার সব ইন্দ্রিয়। আতঙ্কের চূড়ায় পৌঁছলে মানুষ আর বেঁচে থাকতে পারে না। অতএব, আমিও আর বেঁচে থাকতে পারব না। কালো দরজাটা খুলে বাইরে যাবার চেষ্টা করেই আমি রচনা করেছি আমার জীবন্ত কবর। এখন ঘরময় ছড়িয়ে আছে ওটার পায়ের ছাপ, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমার শতাব্দী প্রাচীন পালঙ্কটার নীচেই স্থান করে নিয়েছে সে…’
হাত থেকে খসে পড়ে গেল ম্যানুস্ক্রিপ্টটা।
‘এখন ঘরময় ছড়িয়ে আছে ওটার ছাপ, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমার শতাব্দী প্রাচীন পালঙ্কটার নীচেই স্থান করে নিয়েছে সে…’
মোমবাতির আলোয় ঘরময় যা দেখলাম তাতে আমার চোখ দুটোতে জুড়ে কেবলই রাজ্যের অন্ধকার নেমে এল। সারা মেঝে জুড়ে কেবলই পায়ের ছাপ আর পায়ের ছাপ। রেড অক্সাইডের লাল মেঝের কালো ছোপ ছোপ রক্তের দাগ ক্রমশ ঢুকে গেছে আমার খাটের নীচে। চরম আতঙ্কে অবশ হয়ে গেল সারা শরীর। এর কারণ অতি স্পষ্ট।
‘তার দেহের প্রতিটা স্পন্দন আমার রক্তে ধ্বনিত হচ্ছে… আমি জেনে গেছি… আর একটু পরই খাটের তলা থেকে বের হয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসবে একটা রক্তমাখা হাত…’
কটু গন্ধে ভারি হয়ে গেছে ঘরের বাতাস। এমন সময় খাটের তলা থেকে গভীর শ্বাস ফেলার শব্দ অনুভব করতে পারলাম, কেউ যেন খুব হাঁপিয়ে গেছে—জোরে জোরে শ্বাস নিতে চেষ্টা করছে। খাটের তলায় উঁকি না দিলেও স্পষ্ট বুঝতে পারছি কী ঘটতে চলেছে।
আমার জীবনে এক আতঙ্কের রাত…
কয়েকদিন পর।
সরকারি ডাকবাংলো, ‘মায়াবী’র বারান্দায় জণ্ডিস রঙা একটা চেয়ারে বসে জুনিয়র অফিসার রিয়াজুদ্দিন অপেক্ষা করছে, বগলে মোটাসোটা আকারের কাগজের ফাইল। অনেকক্ষণ জবুথুবু বসে থাকায় তার ঘুম ঘুম পাচ্ছে। সন্ধ্যা নামতে বেশি বাকি নেই, যদিও আকাশ দেখে সকাল থেকেই সন্ধ্যা মনে হচ্ছে, বছরের এই সময়টায় এমনিতে এত বৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। এত মেঘ এল কোত্থেকে?
বারান্দায় বসে ঠাণ্ডা হাওয়ায় শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছিল, ঠিক এমন সময় কেবিনের দরজা খুলে বাইরে এলেন গোয়েন্দা বিভাগের সিনিয়র অফিসার আ.ন.হ. জাকারিয়া। ভদ্রলোক এককালে আকর্ষণীয় স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে স্থূলতার চাপে যাকে বলে পর্যুদস্ত। তিনি রিয়াজুদ্দিনকে দেখে হাসিমুখে বললেন,
‘ফাইলটা কি এনেছ, রিয়াজুদ্দিন?’
‘জ্বী, সার।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ, ভাই। অনেক উপকার হলো। কালই ঢাকায় ফিরব তো তাই একটু গোছগাছে ব্যস্ত ছিলাম।’
ফাইলটা নিজের হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ তাতে চোখ বুলালেন।
‘গত কয়েকদিন ধরে তো থরো ইনভেস্টিগেশন করলাম। আমার মনে হয় ওই লেখক সাহেবের মৃত্যুটা মার্ডার-ফার্ডার কিছু না। সাধারণ হার্ট ফেলের কেস। যদিও বছর চল্লিশের কারও এভাবে মরাটা ঠিক মানায় না। অবশ্য লোকটার ফিগারও দেখতে হবে। এত মোটা শরীরে ব্লাড প্রেসার থাকাটা অদ্ভুত কিছু তো না, তাই না?’
‘জ্বী, সার। আমারও তাই মনে হয়। লোকটা হয়তো কোন কারণে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল আর তাতেই হয়তো হার্টবিট মিস করে বসে।’
আ.ন.হ. জাকারিয়া চিন্তিত স্বরে বললেন, ‘তা তো বটেই হে। বৃষ্টির মধ্যে সারা বাড়ির কম্পাউণ্ড জুড়ে দৌড়াদৌড়ি করা, উত্তেজনার ঠেলায় গেটের চাবি ভেঙে অর্ধেকটা তালার ভেতরেই রেখে আসা, তারপর সারা বাড়ির মেঝে জুড়ে এলোমেলো হাঁটাহাঁটি করা—সবটাই তো আতঙ্কগ্রস্তের কাজ কারবার। এনি ওয়ে, আর কারও পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে কি ওখানে?’
‘না, সার। সব ছাপ ওই এক লোকেরই। শোবার ঘর থেকে শুরু করে সবখানে ওই একই ৯ নম্বরী সাইজের স্যান্ডেলের ছাপ, লোকটা মৃত অবস্থাতেও পায়ে চটি পরা অবস্থায় ছিল। আমাদের এদিকে তো, সার, লাল মাটি। ওই রেড অক্সাইডের লাল মেঝেতে টাটকা কাদা পড়ে থাকলে অনেকসময় রক্তের ছোপের মত দেখায়, আবছা আলোতে হঠাৎ করে দেখলে ভিরমি খাওয়ার দশা হয়। লোকটা এসব দেখেই ভয় পেয়ে গেল নাকি কে জানে?’
আ.ন.হ জাকারিয়া শব্দ করে হাসলেন।
‘লেখক মানুষ তো, হয়তো ওরকমই কিছু একটা ভেবে নিয়ে ভয়টয় পেয়ে বিশ্রীভাবে হার্টফেল করে মারা গেছে। তবে এটা ঠিক, কাকতালীয়ভাবে তালাফালা আটকে না গেলে আর ওই সারা ইলেকট্রিসিটি চলে যাওয়ার ব্যাপারটা না ঘটলে হয়তো লোকটা বেঁচে যেতেও পারত।’
‘জী, সার। তারপর ওই ব্যাপারটাই ধরুন… যদি কাকতালীয়ভাবে মেথরটা ওই অবস্থায় ছাদের পানির ট্যাঙ্কির ভেতর না পড়ত তা হলে কি আর অত বিদঘুটে গন্ধযুক্ত পানি বের হত ট্যাপ থেকে? কাকতালীয় ঘটনা একসাথে এতবার ঘটলে তো ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক, তাই না, সার?’
‘আর ওই ব্যাপারটা বাদ দিচ্ছ কেন? এমন বাজে জিনিস কক্ষনো হতে দেখিনি। একই টেলিফোন নাম্বারে আলাদা আলাদা দুজন কনযিউমার। তাও দুজনের নামই এক। মুক্তাদির না কী যেন নামটা।’
‘মোহাম্মদ মুক্তাদির, সার। দুই জনের মধ্যে একজন অনেক আগে মারা গেছেন। আমরা ভিকটিমের কল লিস্ট ঘেঁটে দেখেছি উনি লাস্ট কলটা যাকে করেছেন তিনি বাই মিস্টেক সেই মৃত মুক্তাদির। ওনার পরিবার অবশ্য রিপোর্ট দিয়েছে যে ওই রাতে তারা ভিকটিমের ফোন পেয়েছিলেন ঠিকই। মুক্তাদির মৃত এটা শুনে ভদ্রলোক নিশ্চয়ই টেনশনে পড়ে গিয়েছিলেন।’
‘সার্টেনলি। আর ওই আসল মুক্তাদির যার সাথে জুনায়েদ সাহেবের খাতির ছিল, তার কী খবর?’
‘শোকে দুঃখে মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার অবস্থা ব্যাটার।’
আ.ন.হ জাকারিয়া ছেলেটির কাঁধ চাপড়ে বললেন, ‘তুমি এতদিন অনেক খেটেছ, রিয়াজুদ্দিন। তোমার প্রমোশনের ব্যাপারটা আমি নিজে দেখব। এখন বাড়ি যেয়ে একটু ঘুম দাওগে।’
তিনি হাতের ফাইলটা বন্ধ করার সময় স্ট্যাপল করা একতাড়া ফুলস্কেপ কাগজ মাটিতে পড়ে গেল।
‘এটা আবার কী হে?’
রিয়াজুদ্দিন সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘ও, সার, আপনাকে বলা হয়নি। এটা ভিকটিমের ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। বোধহয় তার লেখা শেষ গল্পটল্পের খসড়া।’
‘তুমি পড়ে দেখেছ?’
‘সময় পাইনি। তবে এমনি নেড়েচেড়ে দেখেছি। বিশেষ কিছু নেই। স্রেফ গপ্পো।’
আ.ন.হ জাকারিয়া উৎসাহের সঙ্গে বললেন, ‘সমস্যা নাই। জুনায়েদ হায়দার পাশার গল্প আমার ভালই লাগে। দেখি মরার আগে লোকটা কী লিখে গেল।’
‘আমি তা হলে আসি, সার।’
‘ওয়েল, গুড নাইট দেন।’
রিয়াজুদ্দিন বিদায় নিল।
তিনি গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে শোবার ঘরের দিকে চললেন। আকাশে মেঘের গুড়গুড়ানি বেড়েছে, বড়সড় ঝড়জল হতে পারে রাতে। সত্যিই এমন একটা বর্ষণমুখর রাতে জম্পেশ ভূতের গপ্পো নিয়ে বিছানায় যেতে কার না ভাল লাগে?
রাত সোয়া তিনটার দিকে সরকারি গোয়েন্দা আ.ন.হ জাকারিয়া বাথরুম করতে ওঠার সময় টের পেলেন যে অত্যন্ত কাকতালীয়ভাবে তাঁর ঘরের দরজার খিলটা বাইরে থেকে আটকে গেছে। ব্যাপারটা আরও কাকতালীয় হলো যখন একটা প্রচণ্ড বজ্রপাতের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে গোটা এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তাঁর কেন জানি খুব ভয় ভয় করতে লাগল।
